নাইক্ষ্যংছড়িতে চরম আর্থিক সংকট: বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা, শঙ্কায় জনজীবন
আজিজুল হক রানা, নাইক্ষ্যংছড়ি প্রতিনিধি::
বান্দরবানের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা নাইক্ষ্যংছড়িতে জীবন-জীবিকার চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এক সময়ের কৃষি ও বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ এই জনপদের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্রসীমার নিচে। কর্মসংস্থান হারিয়ে একদিকে যেমন বাড়ছে বেকারত্ব, অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে মানুষ জড়িয়ে পড়ছে মাদক ও চোরাচালানের মতো বিপজ্জনক পথে।
সাধারণভাবে স্থানীয়দের বিরুদ্ধে চোরাচালানের অভিযোগ থাকলেও প্রকৃত চিত্র ভিন্ন। তথ্য বলছে, অপরাধে জড়িত স্থানীয়দের হার ৫ শতাংশের নিচে। মূলত ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকে মিয়ানমার সীমান্তকে ইয়াবা পাচারের ‘সেফ রুট’ হিসেবে ব্যবহার করছে রোহিঙ্গারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গত তিন মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইয়াবাসহ আটককৃতদের ৮০ শতাংশই রোহিঙ্গা। স্থানীয় দুর্গম পাহাড়ি পথ ও জঙ্গলকে ব্যবহার করে তারা এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ির বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন দিয়ে সক্রিয় রয়েছে পাচারকারী চক্র: ঘুমধুম ইউনিয়নের নয়াপাড়া, জামালের ঘের, পশ্চিমকুল, ভাজাবনিয়া ও বাইশ ফাঁড়ী। বাইশারী ও সোনাইছড়ি ইউনিয়নের লতাবনিয়া, উঠুনি এলাকা, লংগদুর মুখ, লেবুছড়ি ও বেতছড়ি। সদর ও দৌছড়ি ইউনিয়নের চাকঢালা, আশারতলী, ফুলতলী, জামছড়ি, পাহাড় পাড়া ও তৈনছড়ি এলাকা।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পর থেকে নাইক্ষ্যংছড়ির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থমকে গেছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো, সীমান্ত সড়ক ও মৈত্রী সড়ক নির্মাণের ফলে স্থানীয়দের অধিকাংশ আবাদি জমি অধিগ্রহণে চলে গেছে। সীমান্তের কাঁটাতার ঘেঁষে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র মাইন বিস্ফোরণ এবং অপহরণ আতঙ্কে স্থানীয়রা এখন জমিতে যেতে পারছেন না। নদী ও খালের পানি দূষণ এবং আরকান আর্মির বাধার মুখে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে মৎস্যজীবীরা এখন নিঃস্ব।
কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য রোহিঙ্গা ফান্ডের একটি অংশ বরাদ্দ থাকলেও, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এই ক্ষেত্রে পুরোপুরি অবহেলিত। উপজেলায় কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্প না থাকার অজুহাতে এখানকার ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা কোনো মানবিক সহায়তা বা সরকারি-বেসরকারি বিশেষ বরাদ্দ পাচ্ছে না। এর ফলে দারিদ্র্যের পাশাপাশি শিশুশ্রম ও কিশোর অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট কলামিস্ট ও লেখক শাহজালাল বলেন: “নাইক্ষ্যংছড়িতে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করলেই হবে না, বরং মানুষের পেটে অন্ন দিতে হবে। সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এনজিও ও আইএনজিওগুলোকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে এই অঞ্চলটি অপরাধের এক স্থায়ী আখড়ায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”
স্থানীয়রা মনে করছেন, এখনই কার্যকর কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ না নিলে সীমান্তবর্তী এই জনপদে মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্রতর হবে।