৭ই মার্চের ভাষণ: বিশ্বের বিস্ময়
———————————-
ড. মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী
———————————-
৭ই মার্চ একটি তারিখ নয়, মহাকালের ইতিহাসের একটি অংশ।এই ভাষণের দিন সবাই সপ্রণোদিত হয়ে এসেছিলেন নেতার আহ্বানে, নেতার নির্দেশ শুনতে। সভায় সভাপতি নেই, সঞ্চালক নেই, সম্বোধন নেই, আর কোনো বক্তাও নেই, শুধু তিনিই মুখ্য। সরাসরি বঙ্গবন্ধু জনতার মঞ্চে উঠে সমগ্র জাতিকে সম্বোধন করেন, ‘ভায়েরা আমার’। তাঁর মুখে শব্দটি বড় বেশি মানানসই কারণ জাতীয় নেতাদের ‘স্যার’ সম্বোধনের পরিবর্তে ভাই সম্বোধন করার প্রচলন তিনিই করেন।
বঙ্গবন্ধুর জীবনে ১৮ সংখ্যাটি কাকতালীয় ভাবে জড়িয়ে গেছে। তিনি জীবনে ১৮ বার জেলে যান, ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের কালোরাত্রিতে ঘাতকের ১৮টি গুলি বুকে ধারণ করেন, জালিম শাসক তাঁর দাফন কাফন এবং জানাজার নামাজে ১৮ জন মানুষ অংশ গ্রহণের অনুমতি দেয়। ১৫ আগস্ট ট্রাজেডিতে ১৮ জন শহীদ হন।৭ই মার্চের ১৮ মিনিটের ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানের ১৮ দিন পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পাকিদের হাতে বন্দি হন। এই ১৮ মিনিটের ভাষণে পঞ্চাশ বছরের এক যুবক সমগ্র জাতিকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেন, তাঁর ‘তুমি’ শুনে সমগ্র জাতি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন উৎসর্গ করলো, এমন নেতা দুনিয়ায় বুকে জন্মানো সহজ নয়। তৃতীয় বিশ্বের এক উঁচু নেতা। উচ্চতায় কোনো সাধারণ বাঙালি নন, পাঁচ ফুট ১১ ইঞ্চি। বামুনের মাঝে মহাকায়। কণ্ঠস্বর স্বাধীন, মৃত্যু তুচ্ছ, বীরের সাহসে বুক টান করে দরাজ গলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনীর হাজার হাজার কামান বন্দুক ও গোলাবারুদের সামনে এই ভাষণ বিস্ফোরণ ঘটান তিনটা বিশ মিনিটের সময়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন সেরা কালজয়ী ভাষণটি দিয়েছিলেন বিপ্লবের পর শান্ত সুশৃঙ্খল পরিবেশে।বঙ্গবন্ধু ১ হাজার ১০৮ শব্দের কালজয়ী ভাষণটি দিয়ে ছিলেন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। লিংকনের ভাষণের মত দুনিয়ার প্রায় সেরা ভাষণগুলো ছিলো লিখিত। বঙ্গবন্ধু এই ভাষণ ছিল অলিখিত। এই ভাষণ প্রদানের পূর্বের দিন ৬ মার্চ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক বসে। বৈঠকে কেউ বলেন সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতে আর কেউ বলেন স্বাধীনতা ঘোষণা না করে আলোচনার পথ খোলা রাখতে। বঙ্গবন্ধু কী করবেন তা ভাবতে থাকেন। চিন্তিত বঙ্গবন্ধুকে দেখে বেগম মুজিব বললেন, ‘আল্লাহ নাম নিয়ে তোমার মন দিল অন্তর থেকে যা আসে তা বলে দিবে’। ক্যান্টনমেন্টে তখন প্রস্তুতি চলছিল, যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় ব্যাপক বোমা হামলা করার। ভাষণ প্রদানের সময় চারদিকে আকাশে হেলিকপ্টার উড়ছিল, হামলা করার জন্য। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিলেন কিন্তু ভাষণে চারটি শর্ত জুড়ে দিলেন পাকিস্তানিদের নিকট। (১) মার্শাল ল’ প্রত্যাহার। (২) সেনাবাহিনী ব্যারেকে নিয়ে যাওয়া। (৩) নির্বাচিত প্রতিনিধির নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর। (৪) কয়েক দিনের মধ্যে যে সব হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা। এই চারটি শর্ত জুড়ে দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন তিনি পাকিস্তান ভাঙতে চান না। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সেই ক্ষমতা তিনি গ্রহণ করতে চান। যদি ন্যায্য এই দাবী না মানে তবে পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব তাঁর নয়, পাকিস্তান শাসকের। আর এ সব শর্ত না মানলে স্বাধীনতার ঘোষণা স্পষ্ট উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো। রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো। ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
বঙ্গবন্ধু এই ভাষণের মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে জানিয়ে দিলেন, আমি যদি হুকুম দিতে না পারি, বেঁচে যদি না থাকি, যদি কারাগারে থাকি, তখন তোমাদের সামনে থাকবে এই ভাষণ। এই ভাষণে যা উল্লেখ করেছি তা তোমরা পালন করবে।
তিনি তাঁর ভাষণে সবই বললেন, কিছু বাকি রাখেননি। কিন্তু শত্রুর ফাঁদে পা দেননি। বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হতে চাননি। উল্টো শত্রুকে ফাঁদে ফেলেছেন। যার প্রমাণ পরের দিনের আই এস আই-‘র রিপোর্ট। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সাথে বক্তব্য রেখে চলে গেল। একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা করলো, আরেক দিকে ৪টি শর্ত জুড়ে দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হতে রক্ষা পেয়ে গেল। পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করলেন না। আমাদের নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না। আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো’।
বঙ্গবন্ধু যদি এই ভাষণে বলতেন, বাংলাদেশ আজ হতে স্বাধীন বা যে যেখানে আছো সবাই মিলে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করো। তাহলে ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যার দায়িত্ব তাঁকে নিতে হতো। তিনি চরম ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করলেন, হত্যাকাণ্ড যেন পাকিরা শুরু করে। তখন বাঙালি জনগণ আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করলে দুনিয়াবাসীর সমর্থন মিলবে এবং কেউ বঙ্গবন্ধুকে দোষারোপ করতে পারবে না।
মহানবী (দ.)’র কোন যুদ্ধনীতি আক্রমাণত্মক ও প্রতিশোধমূলক ছিল না, ছিল আত্মরক্ষামূলক। যতক্ষণ কাফেরগণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা বা আক্রমণ শুরু করেনি ততক্ষণ মুসলমানগণ যুদ্ধ শুরু করেননি। আক্রান্ত হওয়ার পর আত্মরক্ষার্থে মুসলমানগণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তেন। বঙ্গবন্ধু মূলত এই যুদ্ধনীতিই অনুসরণ করেছিলেন।
২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকার বুকে যখন ‘অপারেশন সার্চলাইট’-‘র নামে ঘুমন্ত মানুষের উপর একতরফা আক্রমণ করে তখন ২৬ মার্চ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। সমস্ত যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির দায়িত্ব পাকদের ওপর তুলে দেন।
দুনিয়ার সেরা ভাষণগুলো ছিল লিখিত বা পয়েন্ট দেখে উপস্থাপন করা। এ সব বক্তব্য ছিলো অনেক চিন্তা ও গবেষণার ফসল। মহাকালের সাড়া জাগানো ভাষণের মধ্যে প্রথম অলিখিত ভাষণ মহানবি হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘বিদায় হজের ভাষণ’। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ছিলো অলিখিত। এ সব হৃদয় থেকে আসা, হৃদয়ের কথা। জ্ঞান বিজ্ঞানের কথা একবার জানা হয়ে গেলে, আর জানতে হয় না। হৃদয়ের কথা বারবার শুনতে হয়। যেমন একটি গান, কবিতা, উপন্যাস বারবার শুনতে হয়, পড়তে হয়। কারণ এ সব হৃদয়ের কথা। ৭ই মার্চের বক্তব্য যেন একটি বক্তব্যে নয়, ছন্দবদ্ধ একটি কবিতা। তাই এই ভাষণ প্রদানের পর আমেরিকার বিখ্যাত পত্রিকা ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ ৫ এপ্রিল ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুকে আখ্যায়িত করেন, ‘পয়েট অব পলিটিক্স’ রাজনীতির কবি। রাজনীতিকের এই অমর কবিতাটি শতবার শুনলেও আমাদের পুরানো মনে হয় না।
বিশ্বের সেরা ভাষণগুলো সবই প্রদান করা হয় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে। ৭ই মার্চের ভাষণ কামান বন্দুকের গুলির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা ও অধিকারের সত্য উচ্চারণ করেছিলেন কঠিন পরিস্থিতি মুখোমুখিতে। একটি ভাষণ কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ হলে ত্রিশ লক্ষ মানুষ জীবন দিতে পারে, দুই লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারাতে পারে, এটি এক বিশ্বের বিস্ময়। এখনো এই ভাষণ বাঙালিকে উজ্জীবিত করে, অনুপ্রাণিত করে। আজও যখন শুনি, ‘তোমাদের যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো’ মনে হয় তিনি স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি, প্রতিক্রিয়াশীল, জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদেরকে এখনো অনুপ্রাণিত করছে। কারণ পাকিস্তানি আদর্শের সাথে একাত্তরের আদর্শের সংঘাত চার যুগ পরেও চলছে। যা দুনিয়ার কোথাও হয়নি।
৭ই মার্চের ভাষণের হাত ধরে একটি জাতির রাজনৈতিক জন্ম, একটি স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশ। শুধু এটি আমাদের স্বাধীনতার সনদ নয়, মুক্তির সনদ। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি একবার উচ্চারণ করেন। আর ‘মুক্তি’ শব্দটি উচ্চারণ করেন পাঁচ বার।
এ দেশের মানুষকে স্বাধীন করে ছাড়বো না বলে, বললেন, মুক্ত করে ছাড়বো। আর ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ পুরো ভাষণের শুধু এই বাক্যটির মধ্যেই স্বাধীনতা শব্দটি একবার উচ্চারিত হয়। এই বাক্যটিতেও স্বাধীনতা শব্দটির পূর্বে মুক্তি শব্দটি যুক্ত করেছেন। কারণ স্বাধীন তো ১৯৪৭ সালে একবার হয়েছিলাম, কিন্তু মুক্তি মিলেনি। এবারের স্বাধীনতা শুধু স্বাধীনতার জন্য নয়, মুক্তির জন্য। তাই তিনি মুক্তির উপর বড় বেশি জোর দিলেন। একাত্তর সালে স্বাধীনতা অর্জিত। কিন্তু ‘মুক্তি’ মানে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি। এই মুক্তির সংগ্রাম এখনো চলছে এবং চলমান থাকবে। তাই একাত্তরের রণাঙ্গনে যাঁরা যুদ্ধ করেছেন, তাঁরা স্বাধীনতাযোদ্ধা নয়, ‘মুক্তিযোদ্ধা’। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি অপসারণ করে ‘স্বাধীনতাযুদ্ধ’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করে।
‘জয় বাংলা’, ‘সোনার বাংলা’ ‘মুক্তি’ শব্দমালা বঙ্গবন্ধুর অত্যান্ত প্রিয় ছিল। এসব শব্দমালা রবীন্দ্র-নজরুলের। বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রচণ্ড রবীন্দ্র-নজরুল ভক্ত।কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম ‘মুক্তি’। কবিতাটি বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে দাগ কাটে। মুক্তির কথা তাঁর হয়ে উঠে ধ্যান জ্ঞান। একদিন তিনি হয়ে উঠেন বাঙালির মুক্তিদাতা। জয় বাংলা’ মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, জাতীয় স্লোগান। এই ‘জয় বাংলা’ প্রথম উচ্চারণ করেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর এক প্রবন্ধে। নজরুলের ‘জয় বাংলা’, রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’, একটি জাতীয় স্লোগান, অন্যটি জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতীয় কবি, জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতা, জাতির জনক তিনজনই মারা গেছেন আগস্ট মাসে। একাত্তরের রণাঙ্গণে তিন মহাপুরুষের তিনটি বিষয় মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করে। জাতীয় কবি নজরুলের স্লোগান ‘জয় বাংলা’, রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার বাংলা’, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ। বঙ্গবন্ধু-নজরুলের কাঙ্ক্ষিত ‘মুক্তি’- র লক্ষ্যে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বিশেষভাবে বাঙালি বাংলা জয় করেছিলেন বলেই আমাদের জাতীয় এক দিবসের নাম ‘বিজয় দিবস’। দুনিয়ার কোনো জাতির বিজয় দিবস নেই, স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আছে। যে জাতির বিজয় দিবস আছে, সে জাতি কোনোদিন পরাজিত হতে পারে না।
রাজনীতির কবি তাঁর ১৮ মিনিটের অমর কবিতা ৭ই মার্চের ভাষণে ‘আমি’ ‘আমরা’ এবং ‘আমাকে’ এই তিন শব্দমালা প্রায় ৪৪ বার উচ্চারণ করেন। নজরুল যে ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লেখার কারণে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ উপাধি প্রদান করেন, সে কবিতায় ‘আমি’ শব্দটি উল্লেখ করেন ১৪৪ বার। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ছাড়া আর কোথাও ‘আমি’ শব্দটি এত বেশি উচ্চারিত হয়েছে কিনা বলা মুশকিল। এই দুই কৃর্তিমানের ‘আমি’ শব্দটি ব্যক্তিগত অহংবোধের নয়, জাতি শক্তির বিকাশ ও গৌরবের। ৭ই মার্চের ভাষণের লক্ষ্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের নয়। বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ত্যাগ করলে পাকিস্তানিরা তাঁর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি ছিলো। তিনি অনায়াসে হতে পারতেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান। ক্ষমতার পরিবর্তে বাংলার মানুষের অধিকার ও মুক্তিই ছিলো তাঁর মূল লক্ষ্য। এই ভাষণে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না, বাংলার মানুষের অধিকার চাই’। তাঁর নিকট প্রধানমন্ত্রীত্বের চেয়ে অধিকার বড় আর স্বাধীনতার চেয়ে মুক্তি বড়।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। তিনি বাঙালির অধিকারের কথা বলতে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতা প্রদর্শন করেননি। আমরা দেখতে পাই, গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি প্রয়োগে অনেক ভালো চিন্তা ও উদ্যোগ বাতিল হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি প্রয়োগ করে কোনো দাবি আদায় করতে চাননি। ন্যায্য বিচার চেয়ে বলছেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব’।
সুভাষ বসু বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’। বঙ্গবন্ধু বাঙালির রক্ত চাওয়ার আগেই স্বাধিকারের আন্দোলন হতে রক্ত দিতে শুরু করে। তাই তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে বলছেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো।
এই ভাষণে তিনি আরো ঘোষণা করেন, ‘আমরা যখন রক্ত দিতে শিখেছি, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’। সুভাষ বসুর বাঙালির চেয়ে বঙ্গবন্ধুর বাঙালি এখানে অগ্রসর।
তিনি সাড়ে সাত কোটি জনতাকে রক্ত দেওয়ার হুকুম দিয়ে আত্মগোপন বা পালিয়ে যাননি: নিজেও রক্ত দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসেছিলেন
মহাত্মা গান্ধী চেয়েছিলেন অখণ্ড ভারত। জিন্নাহ ছিলেন ভারত ভাগের পক্ষে। তাঁর স্বপ্ন ছিল অবৈজ্ঞানিক পাকিস্তান। ভারতের জাতির জনক যা চেয়েছিলেন তা হয়নি। জিন্নার পাকিস্তান ২৩ বছরে ভেঙে গেলো।
বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তান চাইলেন তখন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আর যখন বাংলাদেশ চাইলেন তখন স্বাধীন বাংলার জন্ম হয়। মহাত্মা-জিন্নার স্বপ্ন পূর্ণ না হলেও বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন অপূর্ণ থাকেনি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ ৫৪ বছর পরও টিকে আছে, ইনশাআল্লাহ অনন্তকাল টিকে থাকবে।
স্বাধীনতার সময় কারো কোনো কথার দাম ছিলো না, তাঁর কথাই বাংলার আইন। তিনি ৭ই মার্চের ভাষণে যা বলেছিলেন, তা জনগণ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তখন তিনি ছিলেন ১২ শ’ মাইল দূরে কিন্তু তাঁর ভাষণে দিয়ে যাওয়া নির্দেশনায় সৃষ্টি হয় একটি জাতি রাষ্ট্রের। এই ভাষণ নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্রে পরিণত করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর ২১ বছর এই ভাষণ বাজানো ও সম্প্রচার ছিলো নিষিদ্ধ। এই ভাষণ বাজাতে গিয়ে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা পঙ্গু হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে। জেল জুলুম নির্যাতন ভোগ কম করেনি। তখন আমরা বলেছিলাম, এই ভাষণ আমাদের জাতীয় সম্পদ। ৪৬ বছর পর দুনিয়ার সেরা সংস্থা জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো ঘোষণা করলেন, এটি জাতীয় সম্পদ নয়, সমগ্র পৃথিবীর সম্পদ। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। জামাত- বিএনপি এই ভাষণের গুরুত্ব বুঝবে কী করে! যেখানে পৃথিবীর সেরা সংস্থা ইউনেস্কোর এই অসাধারণ ভাষণটির গুরুত্ব বুঝতে ৪৬ বছর সময় লেগেছে। যারা এই ভাষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল তারা আজ ইতিহাসে কলঙ্কিত।
৭ই মার্চের ভাষণ যদি পথিবীর সম্পদ হয়, যিনি এই ভাষণ প্রদান করেন তিনি কী বিশ্বের সম্পদ বা বিশ্বনেতা নয়? বিএনপি জামাত এই বিশ্বনেতাকে ৫৪ বছর ধরে অপমান করে আসছে। এখনো করে যাচ্ছে।তারা আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতে গিয়ে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছে। মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছে। এসব রাষ্ট্রদ্রোহীতা। বিরোধীতা করতে গিয়ে তারা রাষ্ট্র ও দলকে এক করে ফেলে। যে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু এই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন, সে স্থানে ১০ জানুয়ারি (১৯৭২) তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। সেই ঐতিহাসিক ময়দানেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে এবং এই ময়দানে মুজিব-ইন্দিরা যুক্তভাবে জনসভায় ভাষণ দেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে এই ঐতিহাসিক ময়দানের স্মৃতি চিহ্ন মুছে দিতে শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠা করে। আর এই ময়দান মেপে ঠিক যে স্থানে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন সে স্থানেই মলমূত্রত্যাগ করার জন্য স্থাপন করে পাবলিক টয়লেট। এখানে আমি মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন মনে করছি।
বিশ্বের অনেক নেতা আছে যারা একটি ভাষণের জন্য মহাকালে অমর হয়ে আছে। আবার কেউ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কারণে বিশ্বে খ্যাতিমান হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ভাষণ সময়ের সাথে সাথে নতুন ভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, হবে। ইতিহাসের পাতা ছেঁড়া যায়, মুছা যায় না। (শেষ)